জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণগুলি ব্যাখ্যা করো | জোয়ারভাটা কীভাবে সংঘটিত হয় | Class 10 Geography

জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণগুলি: দশম শ্রেণির ভূগোলের বারিমণ্ডল অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল “জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণগুলি ব্যাখ্যা করো” অথবা “জোয়ারভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়, তা চিত্র-সহ আলোচনা করো”। এই প্রশ্নটি সাধারণত ৫ নম্বরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জোয়ার ও ভাটা মূলত চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে সমুদ্রের জলরাশির নিয়মিত ওঠানামার ফলে সৃষ্টি হয়।

জোয়ারভাটা কাকে বলে?

সমুদ্রের জলরাশি নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফুলে উঠে উপকূলের দিকে এগিয়ে আসাকে জোয়ার এবং সেই জলরাশি আবার সরে গিয়ে সমুদ্রের জলস্তর নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।

অর্থাৎ, সমুদ্রের জলস্তরের পর্যায়ক্রমিক বৃদ্ধি ও হ্রাসকে একত্রে জোয়ারভাটা বলা হয়।

জোয়ারভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণ

১. চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ

জোয়ারভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণ হল চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, চাঁদ সেই অংশের সমুদ্রের জলকে বেশি আকর্ষণ করে। ফলে ওই অঞ্চলের জলরাশি ফুলে ওঠে এবং জোয়ার সৃষ্টি হয়।

২. পৃথিবীর বিপরীত দিকে জোয়ার সৃষ্টি

পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের বিপরীত দিকে অবস্থিত, সেখানেও জোয়ার সৃষ্টি হয়। পৃথিবী ও চাঁদের যুগ্ম আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে পৃথিবীর বিপরীত দিকের জলরাশি বাইরে দিকে স্ফীত হয়। ফলে ওই স্থানেও জোয়ার দেখা যায়।

অর্থাৎ, পৃথিবীর চাঁদের দিকে থাকা অংশে একটি এবং বিপরীত দিকে আরেকটি জোয়ার সৃষ্টি হয়।

৩. সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ

সূর্যও পৃথিবীর সমুদ্রের জলরাশিকে মহাকর্ষীয় শক্তির মাধ্যমে আকর্ষণ করে। চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট হলেও পৃথিবীর কাছাকাছি হওয়ায় জোয়ার সৃষ্টিতে চাঁদের প্রভাব বেশি। তবে সূর্যের আকর্ষণও জোয়ারভাটার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

৪. পৃথিবীর আবর্তন

পৃথিবী নিজ অক্ষের চারদিকে আবর্তন করে। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান পর্যায়ক্রমে জোয়ারস্ফীতির অঞ্চলের মধ্যে আসে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এই কারণে কোনো একটি উপকূলীয় অঞ্চলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর জোয়ার ও ভাটা দেখা যায়।

৫. চাঁদ ও পৃথিবীর আপেক্ষিক অবস্থান

চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের পারস্পরিক অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের তীব্রতাও পরিবর্তিত হয়। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তখন সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করায় প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয়।

এই প্রবল জোয়ারকে ভরা কোটাল বা Spring Tide বলা হয়।

৬. অর্ধচন্দ্র অবস্থায় মরা কোটাল

চাঁদের প্রথম ও শেষ অর্ধচন্দ্র অবস্থায় সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ পরস্পরের সঙ্গে প্রায় সমকোণে কাজ করে। ফলে জোয়ারের উচ্চতা তুলনামূলকভাবে কম হয়। একে মরা কোটাল বা Neap Tide বলা হয়।

জোয়ারভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়?

জোয়ারভাটার সৃষ্টি মূলত নিম্নলিখিতভাবে ঘটে:

  1. চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে পৃথিবীর চাঁদের দিকের সমুদ্রের জলরাশি চাঁদের দিকে ফুলে ওঠে। ফলে সেখানে জোয়ার হয়।
  2. একই সময়ে পৃথিবীর বিপরীত দিকে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে ওই স্থানেও জোয়ার হয়।
  3. পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান পর্যায়ক্রমে এই দুই জোয়ারস্ফীতির অঞ্চলের মধ্যে আসে।
  4. কোনো স্থান যখন জোয়ারস্ফীতির অঞ্চলের মধ্যে আসে, তখন সেখানে জোয়ার হয়।
  5. জোয়ারস্ফীতির অঞ্চল থেকে স্থানটি দূরে সরে গেলে সমুদ্রের জলস্তর কমে যায় এবং সেখানে ভাটা হয়।
  6. এই প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে চলতে থাকায় সমুদ্রের জলস্তরের পর্যায়ক্রমিক উত্থান-পতন বা জোয়ারভাটা সৃষ্টি হয়।

জোয়ারভাটার সরল চিত্র

পরীক্ষায় চিত্র আঁকার সময় চাঁদ, পৃথিবী এবং দুই পাশে জোয়ারস্ফীতির অঞ্চল দেখানো যেতে পারে।

চিত্রের ধারণা:

                 জোয়ার
                   ↑
                   |
              __________
            /            \
           /   পৃথিবী     \
          |                | ← জোয়ার
           \              /
            \____________/
                   |
                   ↓
                জোয়ার

                     🌙
                    চাঁদ

নোট: পরীক্ষার খাতায় চিত্রটি পরিষ্কারভাবে আঁকতে হবে এবং চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ, জোয়ারস্ফীতি ও ভাটা-র অবস্থান লেবেল করতে হবে।

ভরা কোটাল ও মরা কোটাল

বিষয়ভরা কোটালমরা কোটাল
কখন হয়অমাবস্যা ও পূর্ণিমায়প্রথম ও শেষ অর্ধচন্দ্রে
সূর্য-চাঁদের অবস্থানপ্রায় একই সরলরেখায়প্রায় সমকোণে
আকর্ষণসূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ একই দিকে কাজ করেআকর্ষণ আংশিকভাবে পরস্পরকে প্রশমিত করে
জোয়ারের উচ্চতাবেশিকম
ভাটার নিম্নতাবেশিতুলনামূলক কম

পরীক্ষায় লেখার মতো ৫ নম্বরের উত্তর

প্রশ্ন: জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণগুলি ব্যাখ্যা করো। অথবা, জোয়ারভাটা কীভাবে সংঘটিত হয়, তা চিত্র-সহ আলোচনা করো।

উত্তর: সমুদ্রের জলরাশির নিয়মিত উত্থান-পতনকে জোয়ারভাটা বলে। জোয়ারভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হল:

  1. চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ: চাঁদ পৃথিবীর নিকটবর্তী হওয়ায় তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণে পৃথিবীর চাঁদের দিকের সমুদ্রের জলরাশি ফুলে ওঠে এবং জোয়ার সৃষ্টি হয়।
  2. বিপরীত দিকে জোয়ার: পৃথিবীর বিপরীত দিকে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে জলরাশি স্ফীত হয়ে দ্বিতীয় জোয়ার সৃষ্টি করে।
  3. সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ: সূর্যও সমুদ্রের জলরাশিকে আকর্ষণ করে এবং জোয়ারভাটার ওপর প্রভাব ফেলে।
  4. পৃথিবীর আবর্তন: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে বিভিন্ন স্থান পর্যায়ক্রমে জোয়ারস্ফীতির অঞ্চলে আসে। ফলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর জোয়ার ও ভাটা সংঘটিত হয়।
  5. চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের অবস্থান: অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করায় প্রবল জোয়ার বা ভরা কোটাল হয়। আবার প্রথম ও শেষ অর্ধচন্দ্রে জোয়ারের তীব্রতা কমে মরা কোটাল সৃষ্টি হয়।

সুতরাং, চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ, পৃথিবীর আবর্তন এবং পৃথিবী-চাঁদ-সূর্যের পারস্পরিক অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলরাশির পর্যায়ক্রমিক উত্থান-পতন ঘটে এবং জোয়ারভাটা সৃষ্টি হয়।

জোয়ারভাটা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

জোয়ারভাটা কী?

সমুদ্রের জলস্তরের নিয়মিত বৃদ্ধি ও হ্রাসকে জোয়ারভাটা বলে। জলস্তর বৃদ্ধি পেলে জোয়ার এবং জলস্তর কমে গেলে ভাটা হয়।

জোয়ারভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণ কী?

জোয়ারভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণ হল চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভরা কোটাল কখন হয়?

অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করলে প্রবল জোয়ার সৃষ্টি হয়। একে ভরা কোটাল বলে।

মরা কোটাল কখন হয়?

প্রথম ও শেষ অর্ধচন্দ্রের সময় সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর সঙ্গে প্রায় সমকোণে অবস্থান করায় জোয়ারের উচ্চতা কম হয়। একে মরা কোটাল বলে।

দিনে কয়বার জোয়ার ও ভাটা হয়?

সাধারণভাবে অধিকাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা দেখা যায়। তবে উপকূলের আকৃতি ও স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এর তারতম্য হতে পারে।

শেষ কথা

জোয়ারভাটা সৃষ্টির কারণগুলি Class 10 Geography-এর বারিমণ্ডল অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরীক্ষায় ৫ নম্বরের উত্তর লেখার সময় চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ, বিপরীত দিকে জোয়ারস্ফীতি, সূর্যের আকর্ষণ, পৃথিবীর আবর্তন এবং ভরা কোটাল-মরা কোটালের বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে লিখলে উত্তরটি পূর্ণাঙ্গ হয়। চিত্র থাকলে সেটিতে পৃথিবী, চাঁদ ও জোয়ারস্ফীতির অঞ্চল সঠিকভাবে চিহ্নিত করা উচিত।

Leave a Comment